সংকটে সাহায্য লাভে নামাজ

0
112

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা, ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন। (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৫৩)

ব্যর্থতা, দুর্যোগ, দুশ্চিন্তা নিত্য দিনের সঙ্গী। এসব জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পৃথিবীতে যত মানুষ আছে তাদের সবার ব্যর্থতার গ্লানি টানতে হয়, দুশ্চিন্তা ও দুর্দশাগ্রস্ত হতে হয়। এটা স্বাভাবিক। কিন্তু এই দুশ্চিন্তা, মুসিবত ও বিপদ দূর করতে কী করতে হবে, তা রাসুল (সা.) বলে গেছেন। বাস্তব জীবনে দেখিয়ে গেছেন।

রাসুল (সা.) যেকোনো সংকটে পড়লে তৎক্ষণাৎ নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। তিনি মাঝেমধ্যে বেলাল (রা.)-কে বলতেন, হে বেলাল, আজান দিয়ে আমাদের শান্তি দাও। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৮৫)

তাফসিরবিদ ও ইতিহাসবিদ আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) এ বিষয়ে এক চমৎকার ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তিনি তাঁর বিশ্ব বিখ্যাত গ্রন্থ ‘তাফসির ইবনে কাসিরে’ লেখেন, কুফা নগরীতে একজন বিশ্বস্ত লোক ছিল। তাঁর বিশ্বস্ততার কারণে সে অনেকেরই মালামাল আনা-নেওয়া করত। সে বলল, একবার আমি সফরে বের হলাম। পথিমধ্যে এক লোকের সঙ্গে দেখা হলো। লোকটি জিজ্ঞাসা করল, কোথায় যাচ্ছ? আমি জবাব দিলাম, অমুক শহরে। লোকটি বলল, আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাও। আমি রাজি হলাম। লোকটি আমার সঙ্গে চলল। কিছুদূর যাওয়ার পর একটি দ্বিমুখী রাস্তা সামনে এলো। সে আমাকে বলল এই রাস্তায় চলো, এই রাস্তাটির দূরত্ব কম। আমি বললাম, এই পথ সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা নেই। লোকটি বলল, এই পথ আমার ভালোভাবে জানা আছে। তাঁর কথা অনুযায়ী আমরা এই পথেই চলতে লাগলাম। কিছুদূর যাওয়ার পর আমরা দুর্গম ও বিস্তীর্ণ এক উপত্যকায় গিয়ে পৌঁছলাম।

সেখানে রাস্তার লেশমাত্র নেই। অত্যন্ত ভয়াবহ জঙ্গল, চতুর্দিকে মৃতদেহ পড়ে আছে। আমি অত্যন্ত ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়লাম। লোকটি আমাকে বলল, বাহনের লাগাম টেনে ধরো, এখানে আমার নামার প্রয়োজন আছে। তাঁর কথামতো আমি লাগাম টেনে ধরলাম। সে বাহন থেকে নামল এবং প্রস্তুতি নিয়ে কোমর হতে খঞ্জর বের করে আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হলো। আমি তার থেকে পালায়ন করার চেষ্টা করলাম, সেও আমার পিছু পিছু ছুটল। আমি তাকে কসম দিতে শুরু করলাম। এবং তাকে বললাম, তুমি আমার বাহন এবং আমার কাছে যা কিছু রয়েছে সবই নিয়ে যাও, আর আমাকে ছেড়ে দাও। সে বলল, এগুলো তো আমারই হয়ে গেছে। আমি তোমাকে জীবিত ছেড়ে দিতে চাই না। আমি তখন তাকে আল্লাহর ভয় দেখালাম এবং আখিরাতের শাস্তির কথা উল্লেখ করলাম। কিন্তু সে কোনো কিছুই মানল না। আমি নিরুপায় হয়ে বললাম, আচ্ছা, আমাকে শেষবারের মতো দুই রাকাত নামাজ পড়তে দাও। সে রাজি হলো এবং বলল, তাড়াতাড়ি পড়ে নাও। আমি নামাজ শুরু করলাম। কিন্তু কোরআনের কোনো সুরা আমার মনে আসছিল না। অগত্যা আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। ওই দিকে ওই জালিম লোকটি আমাকে বারবার তাড়া দিচ্ছিল যে জলদি নামাজ শেষ করো। এর মধ্যে আমার মুখ থেকে আল্লাহ তাআলা এই আয়াত বের করে দিলেন। ‘বলো তো কে নিঃসহায়ের ডাকে সাড়া দেন, যখন সে ডাকে এবং কষ্ট দূরীভূত করেন এবং তোমাদের পৃথিবীতে পূর্ববর্তীদের স্থলাভিষিক্ত করেন। সুতরাং আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো উপাস্য আছে কি? তোমরা অতি সামান্যই উপদেশ গ্রহণ করে থাকো।’ (সুরা নামল, আয়াত : ৬২)

আমি সেই আয়াত পড়ছিলাম আর কাঁদছিলাম। এ আয়াতটি আমার মুখে উচ্চারিত হওয়ামাত্রই আমি দেখি জঙ্গলের মধ্য থেকে একজন অশ্বারোহী দ্রুত অশ্বচালনা করে বর্ষা নিয়ে আমার দিকে আসছেন। তিনি কিছু না বলেই বর্ষা মেরে ওই জালিমের পেটে ঢুকিয়ে দেন। তৎক্ষণাৎ সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, এবং মৃত্যুমুখে পতিত হলো। আমি দ্রুততার সঙ্গে আরোহী ব্যক্তির কাছে গেলাম। তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর শপথ! আপনি কে? কোথা থেকে আপনার আগমন? সাহায্যকারী লোকটি বললেন, আমি এই আয়াতের গোলাম। তিনি আশ্রয়হীন আর্ত ও অসহায়ের দোয়া কবুল এবং বিপদ-আপদ দূরীভূত করে থাকেন। আমি তখন আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম এবং সেখান থেকে আমার বাহন ও আসবাবসহ নিরাপদে ফিরে এলাম। (ইবেন কাসির)

বিপদ-আপদ ও যেকোনো মুসিবতে নামাজের মাধ্যমে আল্লাহ থেকে সাহায্য নেওয়া প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য। নামাজ ও ধৈর্য যাবতীয় সংকটের প্রতিকার। এ দুই পন্থায়ই আল্লাহ তাআলার সাহায্য-সহযোগিতা লাভ হয়।

লেখক : সিনিয়র মুদাররিস জামিয়া বাবুস সালাম, বিমানবন্দর, ঢাকা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here